বুধবার, ০১ Jul ২০২৬, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন
ভারতীয় কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর। ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মরাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের পর থেকেই মঙ্গেশকর পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন তিনি। তার বাবা তাকে লক্ষ্মী বলেই ডাকতেন। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নাট্য অভিনেতা ও গায়ক। বাবার কাছ থেকেই তার সংগীতে প্রথম তালিম নেয়া।
ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লতাকে প্রথম হেমা বলে ডাকা হতো। আগের নাম হেমা থাকলেও, বাবার ভাব বন্ধন নাটকের লতিকার চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে হেমার নাম বদল করে রাখা হয় লতা। যে নাম পরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। ভারতরত্ন হয়েছেন। জীবিত অবস্থাতেই তার নামে পুরস্কার দেয়া হতো।
মুম্বাইয়ের পেডার রোডের বাড়িতে, তিনটে ল্যান্ডলাইনের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বসাথে যোগ রেখে গেছেন ভারতের সুরসম্রাজ্ঞী।
কাজের মাঝেই নিজের ধ্যানজ্ঞান রেখেছিলেন। যে কাজ গান গাওয়া। তার প্রথম হিন্দি ছবি মহল এর আয়েগা আনেওয়ালার ৭০ বছর পেরিয়ে গেছে। গানের বাইরে কোনো কিছুতে জড়াননি তিনি।
ছোটবেলা থেকেই জীবনযুদ্ধ। অর্থের তাগিদেই ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছিল। ফিল্মে অভিনয় তেরো বছর বয়সে।
অভিনয় প্রসঙ্গ এলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকর বলতেন, ওই মেকআপ আলো লোকজন গ্ল্যামার একদম ভালো লাগেনি আমার! তাই আর অভিনয় করার কথা ভাবিনি।
জীবনে প্রথম যখন বাবার সঙ্গে মঞ্চে উঠেছিলেন তখন বয়স মাত্র ৯ বছর। অনেকবার বলেছেন, বহুত তকলিফ উঠায়ি হ্যয় ম্যয়নে।
অবশ্য জীবনে সাফল্যের পর উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ট্রাগল তাকে লতা মঙ্গেশকর তৈরি করেছে।
মাটি থেকে উঠে আসা আর মাটির সঙ্গে লেগে থাকা তারারাই সত্যিকারের আর্টিস্ট বলে মনে করতেন তিনি।
তার কাছে যেমন ছিল শচিন টেন্ডুলকার বা অমিতাভ বচ্চন। আকাশ ছুঁয়েও যারা মাটির কাছে থাকেন।
ছোটবেলা থেকেই লতা মঙ্গেশকরের অন্ধ ভক্ত শচিন টেন্ডুলকার। দেশে-বিদেশে সব সময়ই তার সঙ্গী লতাজির গান। তাই নিজের বাড়ির মিউজিক রুমের জন্য লতা মঙ্গেশকরের ব্যবহার করা কোনো জিনিস চেয়েছিলেন শচিন। শচিনের ইচ্ছা মতো, নিজের হাতের লেখা দুটো গান তার হাতে তুলে দেন লতা।
বাবার নাটক লেখা, বাড়িতে গানের ক্লাস, লোকজন- এসব দেখতে দেখতে তৈরি হয়েছেন লতা। প্রথমদিন স্কুলে গিয়েই অন্য বাচ্চাদের গান শিখিয়েছিলেন। সে কারণে শিক্ষকের কাছে বকা খাওয়ায়, পরের দিন থেকে স্কুল যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি।
তার বাবার নট্টকোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে তারা চলে আসেন পুনেতে। বাবাই ছিলেন তার পরিবারের বটবৃক্ষ। হঠাৎ সে বাবা চলে গেলেন। লতার বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর। আছে আশা, ঊষা, মিনা আর হৃদয়নাথ। পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে।
পয়সাও সংসারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ল। কাজে মনপ্রাণ বসিয়ে দিলেন লতা। তবে তিনি শোক আগলে বসে থাকেননি। মাঠে নামলেন লড়াই করতে। সাহায্য পেলেন বিনায়ক দামোদর কর্নাটকির, যিনি ছিলেন নবযুগ চিত্রপট ফিল্ম কোম্পানির মালিক।
১৯৪২ সালে মরাঠি ছবি কিতী হসাল-এ প্রথম গান রেকর্ড করেন লতা। ১৯৪৫-এ নবযুগ চিত্রপট মুম্বাই পাড়ি দেয়।
তার প্রথম উপার্জন ছিল ২৫ টাকা। প্রথমবার মঞ্চে গাওয়ার জন্য লতা ওই ২৫ টাকা পান।
এরপর লতা আসেন আরব সাগরের পাড়ে তার সুরের আসন নিয়ে। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে শুরু করেন উস্তাদ আমন আলি খানের কাছে।
বিনায়কের মৃত্যুর পর গুলাম হায়দার লতার দায়িত্ব নেন। তিনি লতাকে আলাপ করিয়ে দেন প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। শশধর মুখোপাধ্যায় লতার গলার স্বর শুনে বলেছিলেন, বড্ড সরু গলা।
কিন্তু হায়দার জানতেন, এমন এক দিন আসবে যখন সবাই এই লতার পায়ে পড়ে থাকবে গান রেকর্ডিং এর জন্য।
হায়দারের মজবুর ছবিতে ১৯৪৮-এ গান রেকর্ড করেন লতা। এরপর আরো সুযোগ এলেও, তখনো সঙ্গে ছিল সমালোচনা। বলা হতো নুরজাহানকে নকল করেন লতা।
দিলীপ কুমার লতার উর্দু অ্যাকসেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন লতা জানতেন সমালোচনা শুনতে। উর্দু শিখতে শুরু করেন তিনি। অবশেষে ১৯৪৯-এ হিট হয় আয়েগা আনেওয়ালা। সেখান থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত, বিশ্ব সংগীতের জমি লতার কণ্ঠকে জড়িয়ে আছে। অনিল বিশ্বাস থেকে শচীন দেববর্মণ, খৈয়াম, নৌসদ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কল্যাণজি-আনন্দজি, রামচন্দ্রমের মতো অগুনতি পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন লতা।
তার কণ্ঠ মাধুরীর নেশা ছড়াতে থাকে দেশময়, বিশ্বময়। শুধু হিন্দি ছবির গান নয়। গীত-গজল-ভজন- অ্যায় মেরে ওয়াতেন কে লোগোর মতো দেশাত্মবোধক গানে ভারতকে মনখারাপে ভিজিয়ে রাখেন তিনি।
ষাটের দশকে লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলালের ঘরানায় লতার সুরবিহার দেশ রাগ কালকে ছাপিয়ে নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সাতশো গান রেকর্ড করেন লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলালের সঙ্গে।
শোনা যায় লতাকে বিষ দিয়ে মারার চেষ্টাও হয়েছিল। তিন মাস অসুস্থ ছিলেন তিনি। তার গলার রোম্যান্টিকতা আজো ভারতীয় রোম্যান্সের শেষ কথা।
যতীন মিশ্রর বই লতা সুর গাথাতে লতা বলেছেন, প্রায়ই রেকর্ডিং করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়তাম আমি, আর ভীষণ খিদে পেত আমার। তখন রেকর্ডিং স্টুডিওতে ক্যান্টিন থাকত। নানা রকম খাবার পাওয়া যেত কি না, সে বিষয়ে আমার মনে নেই। তবে চা-বিস্কুট খুঁজে পাওয়া যেত তা বেশ মনে আছে। সারা দিনে এক কাপ চা আর দু-চারটে বিস্কুট খেয়েই কেটে যেত। এমনও দিন গেছে, যে দিন শুধু জল খেয়ে সারাদিন রেকর্ডিং করছি, কাজের ফাঁকে মনেই আসেনি যে ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাবার খেয়ে আসতে পারি। সারা ক্ষণ মাথায় এটাই ঘুরত- যেভাবে হোক নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে আমাকে।
১৯৬৩ সাল। ভারত-চিন যুদ্ধে লিপ্ত। জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন সৈন্যরা। লতা গাইলেন, ইয়ে মেরে ওয়াতান কি লোগো গানটি। তার এই গান শুনে কেঁদেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বয়ং।
কণ্ঠ দিয়ে জাতিকে এক করে দিতে পারতেন তিনি। কার্গিলের যুদ্ধেও সেনাদের জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে বেজেছিল লতার সেই গান। আজো ভারতের মতো ভিন্ন ভিন্ন ভাষার রাষ্ট্রে ২৬ জানুয়ারি মানে লতার এই গান।
১৯৭৮ সাল। ভারতের নাইটেঙ্গলকে নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন স্বয়ং রাজ কপূর। তার মেয়ে ঋতু নন্দার বইতে উল্লেখ আছে সেই ঘটনার। লতা অভিনয় করেননি। গান গেয়েছিলেন সত্যম শিবম সুন্দরম। শুধু হিন্দি নয়, আরো পঁয়ত্রিশটা ভাষায় অন্তত হাজার খানেক গান রেকর্ড করেছেন লতা। অভিনয়ের লোভ তাকে কাবু করতে পারেনি।
১৯৭৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে ছয় হাজার মানুষের সামনে লতা মঙ্গেশকরকে প্রথম নিয়ে আসেন মুকেশ। লতার উপর মোহন দেওরা আর রচনা শাহের রচনা থেকে জানা যায়, খালি পায়ে, সাদা বেগুনি পাড়ের সাধারণ শাড়ি আর নিজের হাতে লেখা গানের কাগজ নিয়ে মঞ্চে এসেছিলেন লতা। যেন এক সাধারণ মেয়ে। ততো দিনে হিন্দি ছবির তাবড় নায়িকাদের লিপে তার গান। রেডিও, টেলিভিশনে ঝরে পড়ছে মুক্তদানার মতো সুর।
মান্না দে বলেছেন, যে যত ভালই গাক। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ঈশ্বর বাস করেন। ওর মতো কেউ গাইতে পারবে না। মান্নাদার সঙ্গে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠতা এতটাই ছিল যে, মঙ্গেশকর পরিবার মান্না দে-কে বড় দাদার মতো মানতেন।
নব্বইয়ের দশকে সিনেমার ক্যানভাস বদলালেও লতা রইলেন স্বমহিমায়। নদিম-শ্রবণ থেকে এ আর রহমান, তার আগে আর ডি বর্মণ- কেউ বাদ দেয়ার স্পর্ধা দেখাননি লতাকে। প্রখ্যাত এই সঙ্গীতশিল্পীকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান অফিসার দে লা লিজিয়ঁ দ্য নর প্রদান করেছিল সেদেশের সরকার।
রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর লতার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বলতেন, লতা গলার ব্যাপারে এত পারফেকশনিস্ট যে, ভালবাসলেও আইসক্রিম ছুঁয়ে দেখে না।
জানা যায়, ভরপেট খাওয়া বা আইসক্রিম কোনোটাই গলার জন্য খেতেন না লতা। শোনা যায় রাজ সিং দুঙ্গারপুরের সঙ্গে গভীর বন্ধুতার সুবাদেই লতা এত ক্রিকেটপাগল হয়ে উঠেছিলেন।
বাংলা ছিল তার ভালবাসার জায়গা। কিশোরকুমার আর হেমন্তদা ছিলেন তার রাখি ভাইয়া। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে যাবতীয় গসিপ উড়িয়ে দিয়েছিলেন সুর সম্রাজ্ঞী।
হেমন্ত কন্যা রাণুকে নিজের হাতে সাধ খাইয়েছিলেন। বাংলায় বিবেকানন্দকে নিয়ে গান রেকর্ড করার প্রবল ইচ্ছে ছিল তার। সরস্বতীর ইচ্ছেও বুঝি আটকে রাখে সময়! তা হলে কী পরজন্ম?
সলিল চৌধুরীর মৃত্যুতে দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন, সলিলদা যোগ্যতা অনুযায়ী কিছুই পেল না।
ভারতের সর্বকালের সেরা এই গায়িকা নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই ভালবাসতেন। পা অবধি লম্বা চুল। পা অবধি বিনুনি। হঠাৎ কেউ দেখে ফেলতেন বাড়ি গেলে। খোঁপা, ঘোমটা, শাড়ি… আমিকে আগলে রাখার আত্মবিশ্বাস ছিল তার মধ্যে।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, অমিতাভ বচ্চন বা শচিনকে কি চিৎকার করে বলতে হয় আমি অমিতাভ। আমি শচিন।আমায় দেখ।
অনেকেই জানেন না, ছদ্মনামে গানের পরিচালনাও করেছেন তিনি। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বার বার যখন আনন্দ ঘন নামের কাউকে ডাকা হচ্ছিল, ডকুমেন্ট বলছিল তিনি এখানে উপস্থিত, কিন্তু কেউ পুরস্কার নিতে উঠছিল না স্টেজে। অবশেষে লতা উঠে পুরস্কার নেন। মারাঠি চলচ্চিত্রের রহস্যময় সঙ্গীত পরিচালক আনন্দ ঘন এর রহস্য এভাবেই সবার সামনে আসে।
এক অখণ্ডধার রাগের আলাপ ধুন- এসবের দেশ নেই। ভাষা নেই। তা বয়ে চলে কালের যাত্রায়। এই যাত্রার নাম লতা মঙ্গেশকর। নীরব আত্মার বিপ্লব। বিশ্ব সংগীতের সব জাতি তার কাছে ঋণী। তিনিই পারেন শিল্প, দর্শন, চিত্রকলা, সিনেমা, নাটক, কবিতাকে তার সুরে জাগিয়ে দিতে। এই ঋণ চুকিয়ে দেয়ার নয়। যে সময়ে তিনি এসেছিলেন সেই সময়ের সমগ্র মানব সভ্যতা তার ঋণ নত হয়ে স্বীকার করছে।
লতা মঙ্গেশকর। এক নীরব আত্মা। সরস্বতী। সরস্বতীর সৎকার হয় না!